দীর্ঘ ষোলটি বছর কাঁটিয়েছিলেন ওসমান পরিবারের সাথে। এ মাফিয়া পরিবারের সাথে সখ্যতা থাকার কারণে অনেকটা আরাম আয়েশেই ছিলেন তিনি। যেখানে সরকার বিরোধী আন্দোলন সংগ্রাম করতে গিয়ে বিএনপি নেতাকর্মী ও সমর্থকদের নানাভাবে হেনস্তাসহ শিকার হতে হয়েছে শত শত মামলা-হামলার। সেখানে তিনি ছিলেন বীরদর্পে। কারণ, একটাই ‘ওসমান পরিবারের আর্শিবাদ।’
আসলে বলা হচ্ছে, নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সাবেক সহ সভাপতি ও বন্দর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আতাউর রহমান মুকুলের কথা। আতাউর রহমান মুকুল ২০১৪ সালে ২৬ জুনের নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের উপ সংসদ সদস্য নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে জাতীয় পার্টির মনোনিত প্রার্থী সেলিম ওসমানের পক্ষে কাজ করেন। নিজের অনুসারীদের নিয়ে বিভিন্ন স্থানে প্রচার প্রচারণা ছাড়াও ওই নির্বাচনে সার্বক্ষনিক ছায়ার মত সেলিম ওসমানের পাশে ছিলেন মুকুল। একই বছর ৭ ডিসেম্বর বিজয় র্যালির ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’র স্লোগানেও দেখাগেছে মুকুলকে। ২০১৪, ১৮ ও ২৩ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে শুরু করে গত বছরের জুলাইয়ের আগ পর্যন্ত সময়ে সেলিম ওসমানের পাশেই ছিলেন তিনি।
অথচ, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর সেই মানুষটি যেন রাতারাতি গোলসপাল্টে ফেলেন। ৫ আগস্ট পরবর্তি সময়ে নিজেকে বিএনপির সবচেয়ে বড় নেতা দাবি করতে দেখা গেছে তাকে। এতদিন যিনি বিএনপির পরিচয় দিতেও দ্বিধাবোধ করতেন, সেই তিনিই ৫ আগস্টের পর বিএনপির মনোনয়নের জন্য উঠে পড়ে লাগেন। যে মানুষটিকে বিগত ষোলটি বছর বিএনপির কোন আন্দোলন সংগ্রামে দেখা যায়নি, সেই মানুষটি খালি মাঠে গোল দেয়ার জন্য অনেকটা ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। যার ফলে তাকে প্রকাশ্যে লাঞ্ছিত হতে হয়।
জানাগেছে, গত ২৯ জুন বন্দর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও মহানগর বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক (বহিস্কৃত) আতাউর রহমান মুকুলের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। বন্দর হরিপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সামনে তাকে মারধর ও হেনস্থা করে একদল দুর্বৃত্ত। এ সময় তাকে বিবস্ত্র করার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পরে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে আহত অবস্থায় মুকুলকে উদ্ধার করে। পরবর্তিতে এ ঘটনায় বন্দর থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। বর্তমানে এ মামলার প্রধান আসামী সোনারগাঁও উপজেলা বিএনপির সহ সভাপতি বজলুর রহমানসহ ১৬ জন আসামী জামিনে আছেন বলে জানাগেছে।
এদিকে এ ঘটনার পর থেকে রাজনীতির মাঠে একেবারেই অনুপস্থিত হয়ে পড়েন মুকুল। অপমান ও লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনার কারণেই তিনি অনেকটা নিষ্ক্রিয়তায় চলে যান। তবে হঠাৎ করেই নানা বিতর্কে বিতর্কীত সেই মুকুলকে আবারও মাঠে নিয়ে আসেন মডেল গ্রুপের কর্ণধার মাসুদুজ্জামান মাসুদ। নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে মাসুদকে বিএনপির মনোনয়ন দেওয়ার পরই মূলত মুকুলকে মাঠে টেনে নামান মাসুদ। শুধু তাই নয়, মুকুলসহ আরও বিতর্কীত বিএনপি নেতাদের বহিস্কারাদেশ প্রত্যাহার করিয়ে মাসুদ তাদের কাছে হয়ে উঠেন প্রভূ। সেই থেকেই মুকুল মাসুদের পক্ষে নির্বাচনী প্রচার প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
তবে গত ২৪ ডিসেম্বর নানা নাটকিয়তার মধ্যদিয়ে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের বিএনপির চূড়ান্ত মনোনয়ন পান এ আসনেরই সাবেক তিনবারের সাংসদ অ্যাডভোকেট আবুল কালাম। কালাম সম্পর্কে মুকুলের চাচাতো ভাই হলেও এখনও তিনি মাসুদের পক্ষেই অবস্থান করছেন এবং তার পক্ষে নারায়ণগঞ্জ নির্বাচন কার্যালয় থেকে মনোনয়নপত্রও সংগ্রহ করেছেন। এতে নারায়ণগঞ্জে মুকুলকে নিয়ে আবারও নানা সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
বিএনপির নেতাকর্মীরা বলছেন, আসলে মুকুলের কোন নৈতিক চরিত্র নেই। তিনি মূলত স্বার্থবাদি একজন মানুষ। স্বার্থের কারণে তিনি বিগত দিনে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সাংসদদের সাথে গভীর সখ্যতা গড়ে তোলেছিলেন এবং এখনও তিনি স্বার্থের পিছনেই পরে আছেন। স্বার্থের কারণে ভাইকে (আবুল কালাম) বাদ দিয়ে তিনি মাসুদ সাহেবের নির্বাচনে কাজ করছেন। এটা সত্যিই লজ্জাজনক একটা ব্যাপার। শুধুমাত্র তার মত মানুষদের পক্ষেই এটা করা সম্ভব।
দলীয় নেতাকর্মীরা আরও বলেন, আমাদের কাছে সত্যিই অবাক লেগেছে যে, তার মত একজন চিহ্নিত আওয়ামী দোসরের বহিস্কারাদেশ প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে। এতে ত্যাগী নেতাকর্মীরা খুব কষ্ট পেয়েছে। যারা শুধুমাত্র ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে দল করে তাদেরকে দল থেকে বহিস্কার ছিলো উত্তম। কারণ, তারা দলের জন্য ক্ষতিকর। দলের দুঃসময়ে স্বার্থের কারণে যেব্যক্তি আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে যুক্ত ছিলো এবং সেই ব্যক্তি স্বার্থের কারণে আজ হয়তো দলে ফিরে এসেছে। কিন্তু সেই ব্যক্তি যে স্বার্থের কারণেই আবারও দল ছেড়ে অন্যদলে চলে যাবে না, তার কোন গ্যারান্টি নাই। সুতরাং তাকে দিয়ে দলের কোন উপকার হবে না, বরং ক্ষতিই হবে। তাই দলের হাইকমান্ডদের কাছে আমাদের আবেদন থাকবে, দলের স্বার্থে মুকুলের মত স্বার্থবাজদের বহিস্কারাদেশ পুনরায় বহাল রাখা হউক। এতে দলেরই মঙ্গল হবে।
নারায়ণগঞ্জ আপডেট