ঢাকা | বঙ্গাব্দ

রাতে ভয়ঙ্কর যে সড়ক

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Jan 8, 2026 ইং
রাতে ভয়ঙ্কর যে সড়ক ছবির ক্যাপশন: রাতে ভয়ঙ্কর যে সড়ক
নারায়ণগঞ্জ আপডেট: পুলিশের টহল ও সড়কবাতি না থাকায় রাতের অন্ধকারে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের শিবু মার্কেট থেকে জালকুড়ি কড়ইতলা পর্যন্ত এলাকা। শিবু মার্কেট থেকে জালকুড়ি কড়ইতলা পর্যন্ত সড়কটিতে প্রতিনিয়তই ঘটছে ছিনতাইয়ের মত ঘটনা। পরিবহন শ্রমিক থেকে ব্যবসায়ী, কেউ রক্ষা পাচ্ছেনা ছিনতাইকারিদের কবল থেকে। রাত হলেই সড়কের এ অংশটুকুতে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠে ছিনতাইকারিরা। বিশেষ করে ৫ আগস্টের পর থেকে পুলিশের টহল না থাকায় এসমস্ত ছিনতাইকারিরা আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে। বর্তমানে এ ছিনতাইকারিদের কারণে সবচেয়ে বেশি আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে পড়েছে ব্যবসায়ী মহল। কারণ ইতিমধ্যেই বহু ব্যবসায়ী ছিনতাইকারিদের কবলে পড়ে সর্বস্ব খুইয়েছেন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, শিবু মার্কেট থেকে জালকুড়ি কড়ইতলা পর্যন্ত সড়কটিতে নেই কোন সড়ক বাতি। এ সড়কটি এমনিতেই নির্জন আর সড়ক বাতি না থাকায় রাত হলেই ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে যায় সড়কটি। দিনের বেলায় সড়কটির সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হলেও রাতের বেলায় অন্ধকারে গা ছমছম করে সবার। এসব কারণে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের এ অংশটুকুকেই অপরাধীরা তাদের স্বর্গরাজ্য হিসেবে বেছে নিয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানাগেছে, ৫ আগস্টের আগে এখানে ছিনতাইয়ের ঘটনা এতটা ভয়াবহ ছিলো না। তখন পুলিশ নিয়মিত টহল দিতো। ৫ আগস্টের পরে ছিনতাইয়ের ঘটনা শুধু বাড়েইনি, রীতিমত ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে তারা। পুলিশ কোন টহল না থাকায় আর সড়কে কোন বাতি না থাকায় এ এলাকাটি ছিনতাইকারিদের স্বর্গরাজ্যে পরিনত হয়েছে।

তারা জানান, ছিনতাইয়ের আগে তিনটি লাল রঙের হোন্ডারে (মটরসাইকেল) করে মোট ৬ জন ছিনতাইকারি সারা সড়ক মহড়া দেয়। তারা সবাই এক রঙের গেঞ্জি ও মাস্ক পরে আসে। তারপর তারা দূর থেকে টার্গেট করে। সুযোগবুঝে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর। তাদের হাতে চাপাতি, লোহার রড, ব্ল্যাড ইত্যাদি অস্ত্র থাকায় মানুষ অনেকটা ভয় পেয়ে যায়। তারপর তারা আরও অন্ধকারাচ্ছ স্থানে নিয়ে নিরিহ মানুষের কাছ থেকে সর্বস্ব কেড়ে নেয়। কেউ টাকাপয়সা না দিতে চাইলে তাকে কুপিয়ে জখমও করা হয়। তারা বেশিভাগ ব্যবসায়ীদেরই টার্গেট করে। প্রতিরাতে তারা ছোট-বড় কোন না কোন ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটিয়েই থাকে। 

রাত ১২টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত চলে তাদের এ ছিনতাইয়ের ঘটনা। গত ৫ আগস্টের পর থেকে এই পর্যন্ত এ জায়গায় কমপক্ষে প্রায় অর্ধশতাধীক ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। আর এসব ঘটনায় ছিনতাকারিদের ছুড়িকাঘাতে আহত হয়েছেন ১০-১৫ জন সাধারণ মানুষ। তবে এসব বেশিরভাগ ঘটনায় হয়রানী হওয়ার ভয়ে বেশিরভাগ ভুক্তভোগী থানা পুলিশের তেমন কোন সহযোগী নেননি বলেও জানান স্থানীয় এলাকাবাসী। 

খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, একটা সময় এ সড়কটি ক্রাইমজোন হিসেবে পরিচিত ছিলো গোটা নারায়ণগঞ্জে। প্রতিনিয়তই এখানে ছিনতাই-ডাকাতি ও খুন-খারাপিরমত ঘটনাও ঘটে চলতো। এসব ঘটনায় অতিষ্ঠ হয়ে নারায়ণগঞ্জবাসী বিক্ষোভ করলে অনেকটাই নড়েচড়ে বসে জেলা প্রশাসন। তারা ক্রাইমজোন খ্যাত ওই স্থানে সিসি ক্যামেরাও বসিয়ে ছিলেন। কিন্তু তবুও কোন কাজ হচ্ছিল না। এরপর তারা পুলিশের অতিরিক্ত টহলের মাধ্যমে ছিনতাইয়ের ঘটনা কিছুটা কমিয়ে আনা সম্ভব হলেও পুরোপরি বন্ধ করা যায়নি। এ সড়কের কোন না কোন স্থানে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেই চলছিলো। 
২০১৯ সালের ৭ই মার্চ দুপুর ১২টার দিকে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের শিবু মার্কেট এলাকায় যাত্রীবাহী বাসে উঠে ফতুল্লার পাগলার নন্দনাইলপুর এলাকার প্রাইম টেক্সটাইল মিলের কর্মকর্তা আতাউর রহমানের কাছ থেকে ১ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের সময় জনতার হাতে আটক হয় জুয়েল (৩০) ও জামাল হোসেন (৩৮) নামে দুই ছিনতাইকারী।

২০১৭ সালে ৮ই সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জের শিক্ষানবিশ সাংবাদিক শাহরিয়াজ মাহমুদ শুভ্রর লাশ উদ্ধার করা হয় এ সড়কের পাশের একটি ডোবা থেকে। ছিনতাইকারীরা তাকে হত্যার পর লাশ ডোবায় ফেলে দেয়।

২০১৬ সালের ৩রা এপ্রিল ঢাকার দৃক গ্যালারির প্রশাসনিক কর্মকর্তা ইরফানুল ইসলামের লাশ লিঙ্ক রোডের জালকুড়ি এলাকার একটি ডোবা থেকে উদ্ধার করা হয়। তার হত্যার সঙ্গে কারা জড়িত তা আজও অজানাই রয়ে গেছে। একই বছরের ২৭শে অক্টোবর লিঙ্ক রোডে দিনে দুপুরে যাত্রীবাহী বাসের গতিরোধ করে ২ যাত্রীর কাছ থেকে ৭ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা।

২০১৫ সালের ৩রা আগস্ট রাত পৌনে ১০টায় লিঙ্ক রোডের মাহমুদ নগর এলাকায় চলন্ত যাত্রীবাহী বাসের সামনে বোমা ফাটিয়ে বাসের গতিরোধ করে নুরুল ইসলাম (৪০) নামে এক ব্যবসায়ীকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ২০১৪ সালের ১৬ই এপ্রিল দুপুরে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) নির্বাহী পরিচালক (বর্তমানে পরিবেশ উপদেষ্টা) সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের স্বামী ব্যবসায়ী আবু বকর সিদ্দিক লিটুকে এ লিঙ্ক রোড থেকেই অপহরণ করা হয়েছিল। তবে ৩৫ ঘণ্টা পর অপহরণকারীরা লিটুকে ঢাকার মিরপুরে আনসার ক্যাম্পের সামনে নামিয়ে দিলেও সে ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত তা এখনও পুলিশ উদঘাটন করতে পারেনি। এছাড়া একই স্থান থেকে নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুনের ঘটনায় নিহত সাতজনকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেয়া হয়েছিল।

এদিকে ছিনতাইয়ের ঘটনা ভয়াবহ রূপ ধারণ করায় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিঙ্করোডের এ অংশে দ্রুত পুলিশের টহল চান স্থানীয় এলাকাবাসী। তারা এ জন্য জেলা প্রশাসনের জরুরী হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নারায়ণগঞ্জ আপডেট

কমেন্ট বক্স